এ সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করবে তা গত বছরের শুল্কযুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ব্রিটিশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ডি হালডেন সম্প্রতি এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন। খবর এফটি।
কেন চলমান পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং উদ্বেগজনক, তা নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। ইরান যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি খাত। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা মোট সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিশ্ব তেল বাজারের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন একটি ধাক্কা বলে উল্লেখ করেছেন অ্যান্ডি হালডেন। ফলে তেলের দামে যেমন চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তেমনি বিভিন্ন দেশ নিজেদের জ্বালানি মজুদ থেকে বড় পরিসরে তেল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, যা আগে কখনো ঘটেনি।
সাবেক এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘অনেকেই গত বছরের পরিস্থিতির সঙ্গে এর তুলনা করে আশার আলো খুঁজছেন। প্রায় এক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন শুল্ক আরোপ করেছিল, তখন বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় সম্পদ ও শেয়ারদর কমে গিয়েছিল, স্বর্ণের দাম বেড়েছিল। সেই সঙ্গে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অবাক করা বিষয় সেই বছরটি শেষ হয়েছিল বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের বড় উল্লম্ফন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।’
অ্যান্ডি হালডেন উল্লেখ করেন, তবে এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদহার কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পেরেছিল। কিন্তু এবার জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সে সুযোগ আর নেই। উল্টো যুক্তরাজ্য, ইউরো অঞ্চল ও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বাড়ানোর বা বর্তমান উচ্চ সুদহার বজায় রাখার চাপ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি খরচের কারণে সরকারি ঋণের চাপও বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ইল্ড বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের চাহিদা ও ব্যয় করার সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসছে। এ সংকটের প্রভাব এখন আর্থিক বাজারের ঝুঁকিপ্রবণ খাতগুলোয়ও স্পষ্ট হইয়ে উঠছে।
ব্রিটিশ ব্যাংকের সাবেক এ কর্মকর্তা বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ক্ষেত্রগুলো থেকে বিনিয়োগকারীরা সরে আসছেন। ফলে কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও প্রশ্ন উঠেছে। অঞ্চলটি দীর্ঘকাল ধরে বিনিয়োগ ও মেধার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশগুলোও বড় ধরনের ধাক্কা খাচ্ছে। সাধারণ মানুষের ওপরও এ সংকটের প্রভাব পড়ছে সরাসরি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিকে পশ্চিমা দেশগুলোর শ্রমবাজারে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকায় ভোক্তাদের মধ্যে ভয় বাড়ছে। একদিকে ২০২২ সাল থেকে জীবনযাত্রার খরচ ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে, তার ওপর নতুন করে জ্বালানি খরচ বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
অনেকে প্রশ্ন করছেন, গত বছরের মতো প্রযুক্তি খাত এবারো বিশ্ব অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে পারবে কিনা। এর উত্তর কিছুটা হতাশাজনক বলে জানান অ্যান্ডি হালডেন। বর্তমান বিশ্বে এআই প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য বিশাল পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ফলে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও অনিশ্চয়তা এ প্রযুক্তি খাতের গতিকেও ধীর করে দিতে পারে। তার মতে, গত বছরের ঘটনাবলি অর্থনৈতিকভাবে ভারসাম্যহীন হলেও তা পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখেছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অর্থনৈতিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিকভাবে এক চরম অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।